নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে পদোন্নতি, কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ
নিজস্ব প্রতিবেদক : যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে গ্রেড–১৪ থেকে সরাসরি গ্রেড–৯ এ পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখের ৩৪.০০.০০০০.০০০.০৫১.১২.০০৩৬.২৪.৯৪ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে উচ্চমান সহকারী ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর (গ্রেড–১৪) পদ থেকে সরাসরি নবম গ্রেডের সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতি কার্যকর করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, বর্তমানে কার্যকর নিয়োগবিধি অনুযায়ী এ ধরনের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। তাদের দাবি, প্রচলিত বিধিমালা উপেক্ষা করেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে।
জানা গেছে, এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি রিট মামলার রায়কে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে, যেখানে ১৯৯৩ সালের পুরোনো নিয়োগবিধির বিধান বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে ২০১২ সালের নিয়োগবিধি, যেখানে গ্রেড–১৪ থেকে সরাসরি গ্রেড–৯ এ পদোন্নতির কোনো বিধান নেই। ফলে বিদ্যমান বিধি উপেক্ষা করে কীভাবে এ ধরনের পদোন্নতি কার্যকর করা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সহকারী পরিচালক পদের মোট অনুমোদিত সংখ্যা ১৫৫টি। ২০১২ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী এর ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১০টি পদ পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত। কিন্তু ইতোমধ্যে পদোন্নতির মাধ্যমে ১১২ জনেরও বেশি কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। ফলে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়েও বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতির মাধ্যমে এ পদে থাকায় বর্তমানে পদোন্নতির জন্য কোনো শূন্য পদ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সহকারী পরিচালক পদের যেসব পদ শূন্য রয়েছে, সেগুলো পদোন্নতির জন্য নয়; বরং সরাসরি নিয়োগের জন্য নির্ধারিত। এসব পদে নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ইতোমধ্যে সুপারিশও করেছে। তবে পিএসসির সুপারিশকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একটি রিট মামলা চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একই পদে পদোন্নতির উদ্যোগ প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯৩ সালের নিয়োগবিধিতে গ্রেড–১৪ থেকে গ্রেড–৯ এ পদোন্নতির বিধান রাখা হয়েছিল সে সময়ের ভিন্ন প্রশাসনিক বাস্তবতায়। তখন এই দুই গ্রেডের মধ্যবর্তী কোনো পদ ছিল না। পরবর্তীতে অধিদপ্তরে ১১তম ও ১০ম গ্রেডসহ বিভিন্ন নতুন পদ সৃষ্টি হওয়ায় ২০০৪ সালে নতুন নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা হয় এবং পরে ২০১২ সালে সংশোধিত নিয়োগবিধি কার্যকর হয়। এসব বিধিতে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য উপজেলা বা থানা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের ফিডার পদ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
তবে ১৪তম গ্রেডভুক্ত কিছু কর্মচারী এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলার সময় সরকার পক্ষ আদালতে প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি। বিশেষ করে পুরোনো নিয়োগবিধির প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তীতে নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়টি আদালতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে মামলার রায়ে সরকার পক্ষ পরাজিত হয়।
এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, রিটকারীদের একজন—প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত সাঁট মুদ্রাক্ষরিক শহীদুল ইসলাম—মামলার বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করেছেন এবং আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। এমনকি সরকার পক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ।
এই পদোন্নতির ঘটনায় অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত কর্মকর্তারা মনে করছেন, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে প্রশাসনিক কাঠামোয় অসন্তোষ আরও বাড়বে এবং কর্মদক্ষতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে পদোন্নতির মতো সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।