অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক : বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে অনলাইনে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার। মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিশ্ববিদ্যালয় বাদে) অনলাইন ও সশরীরে (ব্লেনডিং) ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তারা এটা ভাবছেন। বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখানেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘রোজার ছুটি, বিভিন্ন আন্দোলনসহ নানা কারণে কিছু ক্লাস কম হয়েছে। এ কারণে সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাস চালু রাখতে চায় সরকার।’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কাজ করছেন জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামী বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে স্কুল পর্যায়ে এ পদ্ধতি চালুর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও কলেজ পর্যায়েও তা প্রযোজ্য হতে পারে কিনা, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আপাতত ভিন্ন ব্যবস্থাপনা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘জরিপ করে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মানুষ অনলাইনে যেতে চায়। তবে পুরোপুরি অনলাইন আনসোশ্যাল হয়ে যাবে। বিশেষ করে মেট্রোপলিটন এলাকার স্কুলের ক্ষেত্রে আপাতত এ বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।’ এছাড়া ট্রাফিকের কথা বিবেচনা করে ইলেকট্রিক, ব্যাটারি, সোলার এনার্জি সিস্টেমসহ নতুন ‘বাস সিস্টেম’ নিয়ে ভাবছে সরকার।
এর আগে শিক্ষাবিদরা জ্বালানি সাশ্রয়ে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে অনলাইনে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা নিতে সরকারকে পরামর্শ দেন। তারা বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন অভিভাবকরাও। গতকাল সোমবার অভিভাবক ঐক্য ফোরামের নেতারা এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তারা এতে রাজি। এই পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন দেশ আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও জ্বালানি সাশ্রয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস চালুর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যানজট কমানো ও জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসে কার্যকর উপায় হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু থাকলে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে, ফলে জ্বালানির ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। তাই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাস চালু করা যেতে পারে। তবে তিনি করোনা মহামারির অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পিত ও প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন।
তিনি আরও বলেন, সম্পূর্ণ অনলাইন ব্যবস্থার পরিবর্তে সময়সূচি পরিবর্তন বা অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত (হাইব্রিড) পদ্ধতি গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে অভিভাবক সমাজ। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে, যার প্রভাব অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে করোনাকালীন অভিজ্ঞতার আলোকে অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী।
তিনি আরও বলেন, সামনাসামনি ক্লাসের তুলনায় অনলাইনে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার চেয়ে অনলাইনের মাধ্যমে চালু রাখা অনেক বেশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হবে।