ঢাকা, বাংলাদেশ

এসপিএম প্রকল্প : জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে চরম বিতর্ক

প্রকাশিত :

যুগশঙ্খ ডেস্ক : দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র ঘিরে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আহ্বান করা এ দরপত্র গ্রহণের সময় নির্বাচন করা হয় বর্তমান মন্ত্রিসভার শপথ নেওয়ার দিন। এই দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দরপত্র আহ্বানে স্বচ্ছতার অভাব থাকার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও অবহিত করে এর সুরাহা চেয়েছে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি নেদারল্যান্ডসের ‘স্মিত লামনালকো’। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটির দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করারও দাবি তুলেছেন।

এসপিএম হলো গভীর সমুদ্রে স্থাপিত এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বড় ট্যাংকার থেকে অপরিশোধিত তেল বা জ্বালানি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে বা রিফাইনারিতে স্থানান্তর করা হয়। এটি সরাসরি তীরের জেটির সঙ্গে সংযুক্ত না থেকে সমুদ্রে ভাসমান বয়া হিসেবে কাজ করে। এতে সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হয়।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে মেগা প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার না থাকায় এখনো এটি চালু করা যায়নি। কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে নির্মিত ৮ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পটি দেশের কোনো কাজে আসছে না। প্রয়োজনীয় স্টোরেজ না থাকা এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী নিয়োগ নিয়ে জটিলতার কারণে এই মেগা প্রকল্প এখন সরকারের ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের বোঝা এখন নতুন সরকারের কাঁধে। এখন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী নিয়োগের দরপত্র নিয়েও চলছে বিতর্ক।

এজন্য আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুষছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি এ ব্যাপারে কালবেলাকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই এ মেগা প্রকল্পটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার হিসেবে একটি সংস্থাকে বাছাই করে রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের পলায়নের পর সে আলোচনা থেমে যায়। তবে ওই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা হাল ধরে রাখেন। তাদের ছক অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও প্রস্তাবিত মূলধন বিপিসির অনুমিত ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর দরপত্র বাতিল করা হয়।


ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হওয়ার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফা দরপত্রের প্রস্তাব জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এটিকে প্রতারণামূলক হিসেবে দেখছেন ওই কর্মকর্তা। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন পর ও নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়টিকে বেছে নেওয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ১১টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র কেনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিয়েছে। নির্বাচনকালীনের কথা বিবেচনা করে কোম্পানিগুলো নির্বাচনের পর কোনো একদিন দরপত্র গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করতে অনুরোধ করে।

অনেকে অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত ছিল। অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে চলাচলে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। নানা অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বের নামকরা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের প্রযুক্তি দল পাঠাতে পারেনি। এ কারণে তারা পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। বেশিরভাগ কোম্পানি সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রাক-দরপত্রের (প্রি-বিড) সভায় নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত কোম্পানি ‘স্মিত ল্যামনালকো’ এবং মিশরের ‘মেরিডাইভ’ অংশ নিলেও তারা চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়নি। স্মিত ল্যামনালকো বিশ্বজুড়ে ২২টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। কোম্পানিটি দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা মানা হয়নি।

অন্যদিকে, দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে মিশরের কোম্পানি মেরিডাইভের পক্ষ থেকে ঢাকায় মিশরীয় দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠানিক চিঠি দিলেও তাদের অনুরোধ রাখা হয়নি। মেরিডাইভ কাতার এলএনজি এবং আরামকোর সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছে।

জানা গেছে, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের জন্য যে তিনটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিয়েছে, সেগুলো হলো ইন্দোনেশিয়ার ‘পার্তামিনা’, চীনের ‘সিপিসি’ ও ‘হিলন’। এই তিনটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পার্তামিনা নিজ দেশেই ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কেলেঙ্কারিতে জড়িত। দরপত্র কারচুপি ও নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের কারণে তাদের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিপিসি এর আগে বিনা টেন্ডারে মূল এসপিএম প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল।

এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ করতে তারা বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করেছে। এ প্রকল্পের ব্যয় যে কারণে দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ মালয়েশিয়ায়ও সিপিসির বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন প্রজেক্ট বাতিল হয়েছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, সিপিপি কোম্পানিটি ইপিসি সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ হলেও এসপিএম অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রমাণিত অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করতে পারেনি, যা এ প্রকল্পের একটি গুরত্বপূর্ণ যোগ্যতা। এ ছাড়া চীনা কোম্পানি সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোএসএর সঙ্গে একটি অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত ফান্ডিং কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আহ্বান করা দরপত্রটির নানা দিকে তুলে ধরে সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি স্মিত লামনালকো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে কোম্পানিটি দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নানা অসংগতির কথা তুলে ধরেছে। একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো যাতে অংশ নিতে পারে, তার জন্য উদ্যোগ নিতেও বলা হয়েছে ওই চিঠিতে।

এসপিএম প্রকল্পের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমরা জনগণের সরকার হিসেবে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। এ প্রকল্পের বিষয়েও আমরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখব। কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটাও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র : কালবেলা

যুগশঙ্খ