ঢাকা, বাংলাদেশ

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন: বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে হতাশ ইরান

প্রকাশিত :

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা আছে, সে‌টি বোঝে ইরান। তবে মধ্যপ্রাচ্য প‌রি‌স্থি‌তি নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আগ্রাসন নিয়ে স্পষ্ট নিন্দা না জানানোতে কষ্ট পেয়েছে তেহরান। ইরান প্রত্যাশা করে, আগ্রাসী শক্তির ভূমিকার নিন্দা করবে বাংলাদেশ।

বুধবার (১ এপ্রিল) ঢাকায় ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকার ইরান দূতাবাস।

ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যখন আমরা দেখতে পাই স্পেনের মতো অনেক ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনগণের বিশাল মিছিল হচ্ছে; সেখানেও বিভিন্ন কর্মকর্তা এ যুদ্ধের সরাসরি নিন্দা জানাচ্ছেন এবং সমালোচনা করছেন। সেই হিসেবে আমরা আশা করি, বাংলাদেশ কোনো অস্পষ্ট বিবৃতি না দিয়ে এ ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে। আমরা বাংলাদেশকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ভাই মনে করি, তাই আমরা চাই আমাদের সম্পর্ক আরও সুন্দর ও মসৃণ হোক। ভবিষ্যতে আমরা যেন একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। প্রকাশিত বিবৃতিগুলোতে যুদ্ধের ব্যাপারে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এখানে সরাসরি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ আগ্রাসন নিন্দার যোগ্য এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিন্দা জানানোই আমাদের প্রত্যাশা।’

‘আমরা আরব বা মুসলিম কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ একেবারেই চাই না’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা এটাও বুঝি যে বাংলাদেশের কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আছে এবং আমরা চাই না এমন কিছু বলতে যাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়। পাকিস্তান ও তুরস্কসহ অনেক মুসলিম দেশ আমাদের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।’


বাংলাদেশের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ইরান তার অসন্তুষ্টি তুলে ধরে ঢাকাকে কোনো চিঠি দেবে কিনা- জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো চিঠি দেওয়া হবে না। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বিষয়টি তিনি তুলে ধরবেন বলে জানান।

ইরানি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত। রাশিয়া ও চীন মুসলিম দেশ না হয়েও তারা এ ব্যাপারে নিন্দা জানিয়েছে। স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশও সরাসরি নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে, আমরা এই হামলার সমর্থন করি না।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শ‌ক্তিশালী করার বার্তা দেন ইরানি রাষ্ট্রদূত। তি‌নি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। আমরা চাই, আমাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস যদি কোনো তালিকা দেয়, আমরা তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে সহযোগিতা করব।

জলিল রহিমি বলেন, যদি বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির উদ্যোগ নেয় বা কিছু করতে চায়, আমরা অবশ্যই সেটা স্বাগত জানাই। আমরা পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিশর যারা মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং তাদের ধন্যবাদ জানাই।

তি‌নি বলেন, যদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে অবস্থান না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা অন্য দেশগুলোর জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, আজ আমরা কোনো প্রতিবেশী মুসলিম দেশে হামলা করছি না। আমরা শুধু সেই দেশগুলোর ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করছি।অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, এ জন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু এর দায় সেই দেশগুলোর, যারা তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন এই অঞ্চলে সংকট থাকা সত্ত্বেও আরব দেশগুলো কীভাবে আমেরিকাকে ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিল, বা ইসরাইলকে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দিল?

জলিল রহিমি আরও বলেন, আমরা মুসলমানদের মৃত্যুতে দুঃখিত। কিন্তু আমরা দায়ী নই। আমরা আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের অবস্থানে আছি। যারা নিহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, এ জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী সেই দেশগুলো, যারা তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।

জাহাজের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ছয়টি জাহাজের কথা আমাদের জানানো হয়েছে। আমরা ইরানে বিষয়টি জানিয়েছি। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জাহাজগুলোকে সহায়তা করার অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু জাহাজগুলোর স্পেসিফিকেশন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হাতে না আসায় আমরা সেগুলো শনাক্ত করতে পারিনি। আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাহাজগুলোর নম্বর, জ্বালানির ধরন এবং রুটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছিলাম। সেগুলো আমরা পেয়েছি এবং তা নিয়ে কাজ করছি।’

গত সপ্তাহে জাহাজের পূর্ণাঙ্গ স্পেসিফিকেশন পাওয়া গেছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এসব তথ্য ইরানে পাঠানো হয়েছে এবং কাজ চলছে। বাংলাদেশের এ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। সম্প্রতি পেট্রলপাম্পগুলোয় জ্বালানির যে সমস্যা ও দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে, আমরা সচিত্র তথ্যের মাধ্যমে তেহরানে আমাদের ভাইদের সমস্যার কথা জানিয়েছি। এছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতে বাংলাদেশের জনগণ যে প্রতিবাদ ও দোয়া মাহফিল করেছে, সেই সচিত্র তথ্যও আমরা পাঠিয়েছি। আমি আশা করি, জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো অতিসত্বর হরমুজ অতিক্রম করবে এবং বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে।’

যুগশঙ্খ