ঢাকা, বাংলাদেশ

৩০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলা

প্রকাশিত :

যুগশঙ্খ ডেস্ক : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলার নাসিরনগর। এই নাসিরনগর উপজেলার কুলিকুন্ডা গ্রামে প্রায় তিনশত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রেখে শুরু হয়েছে দুইদিনব্যাপী শুঁটকি মেলা। বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিনে দেশীয় ও সামুদ্রিকসহ নানা প্রজাতির শুঁটকির পসরা নিয়ে বসেছেন শতাধিক ব্যবসায়ী। দুই দিনব্যাপী এই মেলাকে ঘিরে হাওর বেষ্টিত অঞ্চলটিতে কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

মেলায় গিয়ে দেখা যায়, কুলিকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসেছে দুই দিনব্যাপী মেলার আয়োজন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী তাদের উৎপাদিত শুঁটকির পসরা সাজিয়েছেন। যেখানে শোভা পাচ্ছে বোয়াল, গজার, শোল, বাইম, টেংরাসহ দেশীয় ও সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি। যা মিলছে প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। মেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই ক্রেতা বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর পুরো মেলা চত্বর। যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা এসেছেন হরেক রকমের মুখরোচক শুঁটকি কিনতে।


স্থানীয়রা জানায়, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখের দ্বিতীয় দিন কুলিকুন্ডা গ্রামে আয়োজন করা হয় দুই দিনব্যাপী শুঁটকি মেলার। যার ঐতিহ্য ৩০০ বছরের প্রাচীন। সেই ধারাকে ধরে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারো কুলিকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শুরু হয় শুঁটকি মেলা। জনশ্রুতি রয়েছে ৩০০ বছর আগে স্থানীয় গ্রামবাসী নদী, বিল ও হাওর থেকে মাছ সংগ্রহ করে শুঁটকি উৎপাদন করে পণ্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বিক্রি করতো। যার ধারা অব্যাহত রয়েছে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে। তবে কালের আবর্তে মেলা শুরুর প্রথম কিছু সময় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে মেলা শুরু হয়। এরপর টাকার বিনিময়ে চলে কেনাবেচা। স্বাদে ও গুণে অনন্য হওয়ায় সকাল থেকেই ক্রেতারা ভিড় করেছেন পছন্দের শুঁটকি কিনতে।

মেলায় আসা ক্রেতা কামরুল আলম ভূঁইয়া জানান, এই মেলার ঐতিহ্য তিনশত বছরের প্রাচীন। প্রতি বছর আমরা এই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি। মূলত এই মেলায় একটি মিলন মেলা ঘটে। সে সঙ্গে আমরা নানান রকমের সুস্বাদু শুঁটকি কিনতে পারি। শুঁটকি সব জায়গায় পাওয়া গেলেও কলিকুন্ডা গ্রামের শুঁটকির মেলায় যে শুঁটকি পাওয়া যায় তার স্বাদ ও গুণ অনন্য।


অপর এক ক্রেতা সাজ্জাদ মোরশেদ সোহান জানান, কলিকুন্ডা গ্রামের শুঁটকি মেলাটি আমাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই শুঁটকি মেলায় আসা হতো। এখন আমি আমার সন্তানদের নিয়ে মেলায় এসেছি। মেলার সার্বিক পরিবেশ অত্যন্ত ভালো বিশেষ করে এখানে মুক্তবাজারের মাধ্যমে ক্রেতা বিক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে শুঁটকি কেনাবেচা করতে পারছেন। আমরা ক্রেতারা যারা আছি মেলা দেখেও সন্তুষ্টি পাচ্ছি কিনেও সন্তুষ্টি পাচ্ছি।


শুঁটকি বিক্রেতা অতীন্দ্র দাস জানান, মেলায় আমরা সব দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি নিয়ে এসেছি। এসবের মধ্যে রয়েছে বোয়াল, শৈল, গজার, ট্যাংরা ইত্যাদি। ক্রেতাদের ভালো সমাগম রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী তারা তাদের পছন্দের শুঁটকি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দুই দিনব্যাপী এই মেলায় প্রতিটি দোকানে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে শুঁটকি বিক্রি হবে। আমাদের দোকানেও এমন বিক্রি হয়। সেখান থেকে যা মুনাফা হবে তা দিয়ে ভালোই থাকবো।


অপর বিক্রেতা রামেশ্বর দাস জানান, মেলার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। বিভিন্ন নদী, বিল এবং হাওর থেকে আমরা দেশীয় মাছ সংগ্রহ করি। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শুঁটকি উৎপাদন করি। স্বাদ ও গুণগতমান বজায় রেখে আমরা শুঁটকিগুলো কুলিকুন্ডা গ্রামের মেলায় নিয়ে আসি। এখানে বোয়াল শুটকি প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১৫শ' টাকা, গজার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১৮শ' টাকা, বাইম শুঁটকি ১৪শ' থেকে ২৪শ' টাকা, টেংরা শুঁটকি ১ হাজার থেকে ১৫শ' টাকা। মেলায় যেরকম বেচাকেনা হচ্ছে এতে আমরা খুশি।

আয়োজক কমিটির সদস্য হোসাইন আহমেদ জানান, ৩০০ বছরের প্রাচীন মেলার ঐতিহ্যের ধারাকে ধরে রেখে এ বছরও আনন্দঘন পরিবেশে শুঁটকি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় মুক্তবাজার ব্যবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি মেলার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা দায়িত্ব পালন করছি। কোন দুর্বৃত্তরা বা দুষ্কৃতিকারীরা যেন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অন্যায় আবদার করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি। প্রশাসনের সদস্যরাও বাজারের সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। আমরা আশা করি এ বছরও ঐতিহ্যবাহী মেলাটি শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে শেষে হবে।

প্রাচীন ঐতিহ্যর ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ শুঁটকি মেলার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে হাওড়া বেষ্টিত জনপদের মানুষের অর্থনীতি এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

যুগশঙ্খ