তিন মামলায় হাসিনা-জয়-পুতুলসহ সাজা হলো যাঁদের
নিজস্ব প্রতিবেদক : পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন পৃথক পৃথকভাবে এ রায় ঘোষণা করেন।
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তাঁদের সন্তানদের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগে ছয় মামলার মধ্যে তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হলো বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর)। এই তিন মামলা হচ্ছে শেখ হাসিনার নিজের নামে প্লট বরাদ্দ নেওয়া, জয়ের নামে প্লট বরাদ্দ নেওয়া এবং ও পুতুলের নামে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলা।
এই তিন মামলায় মোট ২১ আসামিকে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে জরিমানা করা হয়েছে। তিন মামলাতেই খালাস পেয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার।
তিন মামলার প্রত্যেকটিতে শেখ হাসিনাকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এক মামলায় তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে পাঁচ বছর এবং আরেক মামলায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই মামলাগুলোতে আরও যাঁরা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন—
শেখ হাসিনার নামে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে ছয় বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৯ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদারকে এক বছর; রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞাকে পাঁচ বছর; রাজউকের সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) শফিউল হক, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকারকে ছয় বছর;
প্লট বরাদ্দে দুর্নীতি: ৩ মামলায় শেখ হাসিনার মোট ২১ বছরের কারাদণ্ডপ্লট বরাদ্দে দুর্নীতি: ৩ মামলায় শেখ হাসিনার মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড
সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীকে (অব.) তিন বছর; সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফকে এক বছর এবং সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে এক বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জয়ের প্লট বরাদ্দে মামলা—
সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় শেখ হাসিনা ও জয় ছাড়া আরও ১৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই মামলার রায়ে শরীফ আহমেদ, মো. শহীদউল্লাহ খন্দকার, কাজী ওয়াসি উদ্দিন ও মো. সালাহউদ্দিনকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্লট দুর্নীতির পৃথক মামলায় জয়-পুতুলের ৫ বছর করে কারাদণ্ডপ্লট দুর্নীতির পৃথক মামলায় জয়-পুতুলের ৫ বছর করে কারাদণ্ড
জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদারকে এক বছর; রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞাকে পাঁচ বছর; সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে এক বছর; সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), তন্ময় দাস ও মো. নুরুল ইসলামকে তিন বছর; সাবেক সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মাজহারুল ইসলাম এক বছর; সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) নায়েব আলী শরীফ এক বছর এবং পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মো. কামরুল ইসলামকে তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পুতুলের প্লট বরাদ্দে মামলা—
এই মামলায় মামলায় শেখ হাসিনা ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়া আরও ১৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, শহীদ উল্লাহ খন্দকার ও কাজী ওয়াসি উদ্দিনকে ছয় বছর; আনিছুর রহমান মিয়াকে পাঁচ বছর; মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, মেজর শামসুদ্দিন, তন্ময় দাস, কবির আল আসাদ, শেখ শাহিনুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পূরবী গোলদার, মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাবিবুর রহমান সবুজকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অর্থদণ্ড
এই তিন মামলায় দণ্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে এক লাখ টাকা করে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৬ মাস করে ১৮ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুতুল ও জয়কে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৬ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
এছাড়াও তিন মামলায় অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন পরিমাণে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গত ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর সড়কের একটি ১০ কাঠার প্লট নিজ নামে এবং অন্য দুটি প্লট তাঁর ছেলে ও মেয়ের নামে বরাদ্দ নেন। ঢাকায় বাড়ি থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা হলফনামা দাখিল করে এই প্লট বরাদ্দ নেন তাঁরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ও সরকারি কর্মচারী (পাবলিক সার্ভেন্ট) হিসেবে বহাল থেকে তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ করে প্রকল্পের বরাদ্দবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বা রাজউক কর্মচারীদের প্রভাবিত করে নিজের ও ছেলে-মেয়ের নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। বরাদ্দবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক প্রতিমন্ত্রীও প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটান। অন্যদিকে রাজউক এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বরাদ্দবিষয়ক কর্মচারীরা নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ দেন।