তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ায় শঙ্কা
কামাল মোশারেফ : বাংলাদেশে এইচআইভি ও এইডস সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ১৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৮০ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে (২০২২–২০২৫) দেশে নতুন করে ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্তত ৬০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৮৮২ জন। সীমান্তবর্তী জেলা যশোর, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হন ৯৪৭ জন এবং মারা যান ২৩২ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৭৬ জন এবং মৃত্যু হয় ২৬৬ জনের। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩৮ জন এবং একই সময়ে মারা গেছেন ১৯৫ জন। আগের বছরের তুলনায় সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে।
যশোরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়েছে
সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে এইচআইভি সংক্রমণের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪০ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২৫ জনই শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১৭ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালে যেখানে শিক্ষার্থী আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২ জন, সেখানে চলতি বছরে মাত্র ১০ মাসেই সেই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
বর্তমানে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টারে মোট ২২০ জন এইচআইভি ও এইডস আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
যশোর এআরটি সেন্টারের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. কানিজ ফাতেমা বলেন,
“তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার যেভাবে বাড়ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিরাপদ আচরণ ও যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।”
রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জেও বাড়ছে সংক্রমণ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন করে ২৮ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলায় এ পর্যন্ত ২৫৫ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ইনজেকশনভিত্তিক মাদক ব্যবহারকারী।
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সেলর মাসুদ রানা জানান,
“ইনজেকশনভিত্তিক মাদক ব্যবহার এই জেলায় এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও নিয়মিত কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে।”
সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে অপ্রতুল শিক্ষা, কনডম ব্যবহারে অনীহা, অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, ইনজেকশনভিত্তিক মাদক ব্যবহার এবং সামাজিক ট্যাবু ও স্টিগমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের লক্ষ্যে ৯৫–৯৫–৯৫ কৌশল গ্রহণ করলেও এখনো লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা পর্যায়ে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র বাড়ানো এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা জোরদার করা না গেলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। যদিও সামগ্রিক সংক্রমণের হার এখনও ০.১ শতাংশের কম, তবু প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংক্রমণ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশকে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলছে।