ঢাকা, বাংলাদেশ

কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি চিহ্নিত করে ‘র’ তালিকা দিতো : ইকবাল করিম ভূঁইয়া

প্রকাশিত :

নিজস্ব প্রতিবেদক : আমি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি যে, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকির ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করে এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিলো—তার একটিতে তাদেরকে কাজ করতে দেয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিতো। এ লিস্টের ওপর ডিজিএফআই কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছে কি না—তা আমার জানা নেই বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

শতাধিক গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইকবাল করিম ভূঁইয়া দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলায় ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্য প্রদান শেষ হয়েছে। তাকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জেরা করার জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ নেয়া হয়।

জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া র‌্যাবের অফিসারের বিরুদ্ধে ৩টি চাঞ্চল্যকর ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন কনিষ্ঠ অফিসার র‍্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন। র‍্যাব থেকে যারা ফিরে আসতো তাদেরকে আমি প্রথম প্রশ্ন করতাম যে, তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? এই অফিসারকে আমি একই প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তরে বললো ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম—ছয় জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছো? উত্তরে বললো—দুই জনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চার জনকে হত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম—প্রতি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছো? উত্তরে সে বললো—দশ হাজার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম— টাকা নিয়ে কি করেছো? উত্তরে সে বললো টাকাগুলো সে গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে, এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।’

দ্বিতীয় ঘটনাটি উল্লেখ করে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘একজন লে. কর্নেল আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমার অফিসে আসেন। আমি তাকেও জিজ্ঞাসা করি কয়জনকে হত্যা করেছো? সে বললো ছয়জন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম— কেন করেছো? উত্তরে সে বললো—ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম— আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার কি না? সে বললো হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাস করলাম আমি যদি আমার....তোমাকে খেতে বলি খাবে কি না? সে বললো না। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং .....খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বললো নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম তাহলে কেন করেছো? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।’

তৃতীয় ঘটনাটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন মেজর যিনি আগে আমার সঙ্গে চাকরি করেছেন। র‍্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি আমার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিলো হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। র‍্যাব, যার মধ্যে উক্ত মেজরও ছিলো, সে ব্যক্তিদেরকে হত্যা করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি—তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছো? সে বললো—এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম— তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদেরকে হত্যা করেছো তুমিওতো সমাজবিরোধী ব্যক্তি। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই সে র‍্যাবে আর এই ধরনের কাজ করবে না। কিন্তু হতাশার সঙ্গে দেখি কিছুদিন পর সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে যেখানে দেখা যায় যে শাপলা চত্ত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের মধ্যে এগুলো ছিলো অল্প কয়েকটি উদাহরণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘শাপলা চত্বরের ঘটনাটি আমরা সকলেই জানি। তবে সাল ও তারিখ মনে নেই। ঐ দিন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলো—এটা তার পটভূমিতে তোলা ছবি।’ আমি শুনেছি র‍্যাব যাদেরকে হত্যা করতো তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিতো বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

যুগশঙ্খ