হতদরিদ্রদের মাসিক ৫ হাজার টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি ইসলামী আন্দোলনের
নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি মাসে নগদ ৫ হাজার টাকা সহায়তাসহ ৩০টি মৌলিক দফা এবং ১২টি বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পুরোমাত্রায় বাস্তবায়ন করা হবে। ইসলামী আন্দোলন সংস্কারে যেসব বিষয় উত্থাপন করেছিল, যেমন পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। সেগুলোও রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ধারাক্রম অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় এসব কথা বলেন তিনি।
ঘোষিত ইশতেহারে ১২টি বিশেষ কর্মসূচি হলো— প্রাথমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন এক বেলা করে পুষ্টিকর খাবার; ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণের ব্যবস্থা করা; সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্যকার্ড; ভর্তুকি মূল্যে কৃষি উপকরণ দেওয়া ও বিভিন্ন সেবা সহজে পৌঁছাতে কৃষিকার্ড চালু করা; ন্যাশনাল জব পোর্টাল (যেখানে সব পেশার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য দেশে ও বিদেশে চাকরি খোঁজা, পরামর্শ প্রদান ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুবিধা থাকবে); কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং ঢাকাসহ সব নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজ ভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা।
এছাড়া বিশেষ কর্মসূচিতে আরো রাখা হয়েছে- সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা; সবার জন্য নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা; নারী পোশাক কর্মীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় পদে ওলামায়ে কেরামের পদায়ন।
ইশতেহার ঘোষণায় চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, বাংলাদেশে বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ দেশের বিদ্যমান সংবিধান মেনেই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছিল। আমাদের সংবিধানে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেই সুযোগ করে দেয়া আছে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে একক ব্যক্তিকে অতিমাত্রায় ক্ষমতায়িত করা আছে। আমরা ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করব। বাংলাদেশ উপনিবেশ থেকে দুই-দুইবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হলো, আমাদের জনপ্রশাসন এখনো ব্রিটিশ আইন, আচার-প্রথা ও রীতি-নীতিতে পরিচালিত হয়। ফলে জনপ্রশাসনে কর্তব্যরতরা নিজেদের জনতার সেবক না ভেবে প্রভু ভাবেন। আমরা এর আমূল পরিবর্তন আনব।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের লক্ষ্য হবে রাজস্ব আয়-জিডিপি হারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, যাতে আগামী পাঁচ বছরে এ হার দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের সমপর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষ বিধানে এনবিআরে যেসব সংস্কার কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা দুষ্কর। মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করার ঘটনা খুবই সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সেজন্য আমরা স্বনির্ভর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব। আকাশ, নৌ ও স্থল বাহিনীর সক্ষমতা বিশ্বমানের করে তুলব।
৩০ দফা মৌলিক ইশতেহার
১. দেশের স্থায়ী শান্তি ও মানবতার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন।
২. দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদকমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
৩. সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
৪. রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র শরীয়াহর প্রাধান্য।
৫. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যমুক্ত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ গঠন।
৬. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ, কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
৭. সার্বজনীন কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ।
৮. পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রসংস্কার।
৯. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১১. নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ সকল জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবাধিকার সুরক্ষা।
১২. রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিতে বৈষম্য বিলোপ।
১৩. সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
১৪. পরিবেশ দূষণ রোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্ব।
১৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ।
১৬. শুধু দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমন নয়, নির্মূলকরণ কর্মসূচি গ্রহণ।
১৭. শুধু আইনের শাসন নয়, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা।
১৮. জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠায় পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বাস্তবায়ন।
১৯. মানুষের সার্বিক কল্যাণে ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয়।
২০. দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন ও অনৈতিক পেশার সঙ্গে জড়িতদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধকরণ।
২১. খুন, গুম, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা, জুলুম, নির্যাতন ও দুঃশাসনের অবসান।
২২. জনগণের বাক্স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
২৩. নারীদের শুধু সমঅধিকার নয়, অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা।
২৪. শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, স্যুয়ারেজ ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু।
২৫. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ।
২৬. কওমি মাদরাসার ডিগ্রিধারীসহ দক্ষ ও যোগ্য ওলামায়ে কিরামকে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা।
২৭. সড়ক নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ।
২৮. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা।
২৯. শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৩০. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
১২টি বিশেষ কর্মসূচি
১. হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা।
২. প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন একবেলা পুষ্টিকর খাবার।
৩. ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণ।
৪. সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্যকার্ড চালু, ভর্তুকিমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং কৃষিকার্ড প্রবর্তন।
৫. ন্যাশনাল জব পোর্টাল, যেখানে দেশে ও বিদেশে চাকরি খোঁজা, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের সুবিধা থাকবে।
৬. কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন।
৭. ঢাকাসহ সকল নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা।
৮. সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা চালু।
৯. সকলের জন্য নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ।
১০. নারী পোশাকশ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।
১১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
১২. কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় পদে ওলামায়ে কেরামের পদায়ন।