জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে ২৬ অগ্রাধিকার ও ১০ প্রতিশ্রুতি
নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’গড়তে নির্বাচনী ইশতেহারে ১০ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি ‘না’ রয়েছে। ‘হ্যাঁ’-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। ‘না’-এর মধ্যে আছে- দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি। ইশতেহারে মোট ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল, মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সদস্য অন্তর্ভূক্তি।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর ‘জনতার ইশতেহার’-এর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন করা হয়।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে বলেন, আমরা রাজনীতিতে বলি ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কিন্তু ৫৪ বছরে সেই স্লোগানের স্বাক্ষর কি দিতে পেরেছি। বৈষম্য ৫৪ বছর আগেও ছিল। তিনি বলেন, ৪৭ না হলে ৭১ হতো না, ৭১ না হলে ২৪ পেতাম না। একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইশতেহার কেবল দলীয় কর্মসূচি না, বরং জাতির প্রতি দলের পরিকল্পনা; এটি একটি জীবন্ত দলিল। জনগণের মতামতে ইশতেহারে প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে জামায়াত আমির বলেছেন, আমাদের ইশতেহারে আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষা, পরামর্শ চেয়েছি।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নারীদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয় সেজন্য মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেছি। অথচ এটা নিয়ে নানা কথা ছড়ানো হলো। আমরা নাকি নারীদের চাকরি করতে দিতে চায়না। আমরা চাই অনেক নারী মা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন, তাদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয়, সেজন্য কর্মঘণ্টা শিথিল করার কথা বলেছি। এতে ওই মা চাকরিও করতে পারবেন, আবার সন্তান লালন পালন করতে পারবেন। ওই মায়েদের সন্তানদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার থাকবে। আর বেতনের ক্ষেত্রে ওই মা যত ঘন্টা কাজ করবেন, মালিক ততটুকুর বেতন দিবেন, বাকি সময়ের বেতন দিবে সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমরা বেকার ভাতা নয়, যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেবো। চা শ্রমিকদের জন্য ইনসাফ করা হবে। একজন চা শ্রমিকের সন্তান যেন একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে অশান্তি দূর করতে চায়। পাহাড়ি-বাঙ্গালি দূরত্ব ও বৈষম্য দূর করতে চায়।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের ইশতেহার হলো জনবান্ধব, ব্যবসা বান্ধব, শান্তি বান্ধব ও শৃঙ্খলা বান্ধব। আমরা বেসরকারি ব্যবসাকে বেশি উৎসাহিত করতে চায়। শিল্প মালিকরা হবেন দেশের আইকন। তাদের আমরা শিশুর মতো যত্ন নেবো। তিনি বলেন, ‘জামায়াত বিজয়ী হলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মন্ত্রী থাকবে।’
উল্লেখ্য, আট ভাগে ৪১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করছে জামায়াতে ইসলামী। যার মধ্যে ২৬টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ ও ছয়টি ‘না’।
ইশতেহারের প্রথমভাগে রয়েছে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ভাগে আত্মনির্ভরতার পথ নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, তৃতীয়ত ভাগে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপকভিত্তিতে কর্মসংস্থান, চতুর্থ ভাগে স্বনির্ভর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, পঞ্চম ভাগে মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন, ষষ্ঠ ভাগে সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সপ্তম ভাগে যুবকদের নেতৃত্ব প্রযুক্তি বিপ্লব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও অষ্টম ভাগ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র।
নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলো হলো-
১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।
২ বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আদেরকে প্রাধান্য দেয়া।
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা।
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।
১৯. আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।
২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুধী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।