পবিত্র হজ পালন করতে যেসব স্থানে যেতে হয়
যুগশঙ্খ ডেস্ক : পবিত্র কাবা আল্লাহ তাআলার ঘর। এটি মসজিদুল হারামের মাঝখানে অবস্থিত। এটি একটি ছাদযুক্ত, চতুর্ভুজ আকৃতির ঘর। এর দরজার দিকের দেয়ালের প্রস্থ ১১.৬৮ মিটার, হিজরের দিকের দেয়াল ৯.৯০ মিটার, শামি রুকন ও ইয়ামানি রুকনের মাঝখানে ১২.০৪ মিটার, হাজরে আসওয়াদ ও ইয়ামানি রুকনের মাঝখানে ১০.১৮ মিটার।
এর উচ্চতা ১৪ মিটার এবং ভিত্তির ক্ষেত্রফল ১৪৫ বর্গমিটার। পবিত্র কোরআনে কাবা শব্দ দুইবার ব্যবহৃত হয়েছে (দেখুন—সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯৫ ও ৯৭)।
‘কাবা’ নামকরণের বিষয়ে দুটি মত আছে—
প্রথম মত : উঁচু হয়ে থাকা ও উত্থিত হওয়ার কারণে একে কাবা বলা হয়েছে। আরবি ভাষায় প্রত্যেক উঁচু জিনিসকেই ‘কাব’ বলা হয়।
দ্বিতীয় মত : এর নির্মাণ চতুর্ভুজ আকৃতির হওয়ার কারণে একে কাবা বলা হয়েছে। আরবদের কাছে প্রতিটি চতুর্ভুজ ঘরই কাবা নামে পরিচিত।
কাবা শরিফের চারটি প্রসিদ্ধ রুকন আছে, যা মূল চার দিকের সামান্য কৌণিকভাবে অবস্থান করে—
উত্তরে : ইরাকি রুকন
দক্ষিণে : ইয়ামানি রুকন
পূর্বে : হাজরে আসওয়াদ
পশ্চিমে : শামি রুকন।
আল-বাকরি তাঁর ‘আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক’ গ্রন্থে কাবার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘কাবার উচ্চতা আকাশের দিকে ২৭ হাত।
এর সম্মুখভাগে হাজরে আসওয়াদ থেকে শামি রুকন পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২৫ হাত, হাজরে আসওয়াদ থেকে ইয়ামানি রুকন পর্যন্ত ২০ হাত। এর পশ্চাত্ভাগে ইয়ামানি রুকন থেকে পশ্চিম রুকন পর্যন্ত ২৫ হাত এবং শামি রুকন থেকে পশ্চিম রুকন পর্যন্ত ২১ হাত। এর দেয়ালের পুরুত্ব দুই হাত।’
মিনায় হজের আনুষ্ঠানিকতা
মিনা ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এখানে ইবরাহিম (আ.) নিজ পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দেওয়ার জন্য এনেছিলেন।
মিনায় বেশি পরিমাণে পশু জবাই করা হয়। তাই এ স্থানকে মিনা বলা হয়। কারো কারো মতে, আরবরা কোনো স্থানে বেশি মানুষের সমাগম হলে সেটিকে ‘মিনা’ বলে অভিহিত করে। যেহেতু এই স্থানে অধিক সংখ্যায় জন্তু জবাই হয় এবং লাখ লাখ হজযাত্রী এখানে অবস্থান করেন, তাই এটি ‘মিনা’ নামে পরিচিত।
মিনা হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান পালনের স্থান হিসেবে সুপরিচিত। হজের কার্যক্রম মূলত মিনা থেকেই শুরু। গোসল করে ইহরাম পরিধান করে জোহরের আগেই হজযাত্রীরা মিনায় আসতে থাকেন। সেখানেই তাঁরা রাত যাপন করেন। ১০ তারিখ ঈদুল আজহার দিন হজযাত্রীরা মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসেন। সেদিন বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে হজযাত্রীরা ‘হাদি’ কোরবানি করেন। মাথা মুণ্ডন করে বা চুল ছোট করে প্রাথমিকভাবে হালাল হন। অতঃপর হারামে ‘তাওয়াফে ইজাফা’ আদায় করে আইয়ামুত তাশরিকের (১০, ১১, ১২ তারিখ) দিনগুলোতে মিনায় থাকতে হয়।
স্মৃতির স্মারক সাফা-মারওয়া
পবিত্র কাবার সন্নিকটে অবস্থিত দুটি পাহাড়ের নাম সাফা ও মারওয়া। কাবার উত্তর-পূর্ব কোণে কাবা চত্বর ঘেঁষেই সাফা পাহাড়ের অবস্থান। প্রাক-ইসলামী যুগে পৌত্তলিকরা এই পাহাড় দুটির ওপর দুটি মূর্তি স্থাপন করে সেগুলোর পূজা করত। ইসলামের আবির্ভাবের পর সাফা ও মারওয়া সাঈ (প্রদক্ষিণ) করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। অতএব, যে কাবায় হজ অথবা ওমরাহ করে, তার জন্য উভয় স্থানের তাওয়াফ করায় কোনো দোষ নেই...। (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৮)
ইবরাহিম (আ.) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে মক্কার সাফা-মারওয়া পাহাড়ের সন্নিকটে রেখে যান। এই জনমানবহীন মরুভূমিতে মা ও শিশুর পানাহারসামগ্রী ফুরিয়ে যায়। তখন ইসমাইল (আ.)-এর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে মা হাজেরা শিশুসন্তান ইসমাইলের জন্য পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ছোটাছুটি করেন। তার পরই আল্লাহর কুদরতে শিশু নবী ইসমাইল (আ.)-এর পদাঘাতে, অন্য বর্ণনা মতে, জিবরাঈল (আ.)-এর পায়ের আঘাতে পানির ঝরনা প্রবাহিত হয়। মা হাজেরার পুণ্যময় স্মৃতির স্মারক হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত হজযাত্রীদের জন্য সাফা-মারওয়া সাঈ করা বা দৌড়ানো আল্লাহ তাআলা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। হজ ও ওমরাহর ফরজ তাওয়াফের পর সাফা-মারওয়া সাঈ করা সব হজযাত্রীর জন্য ওয়াজিব।
সাফা পাহাড় কাবাঘর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ১৩০ মিটার দূরে অবস্থিত। সাফা একটি ছোট পাহাড়, যার ওপর বর্তমানে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে; এবং এই পাহাড়ের একাংশ এখনো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, আর বাকি অংশ পাকা করে দেওয়া হয়েছে। সমতল থেকে উঁচুতে এই পাকা অংশের ওপরে গেলে সাফায় উঠেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে। সাফা পাহাড়ের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এখনো পবিত্র কাবা দেখা যায়।
মারওয়া শক্ত সাদা পাথরের ছোট্ট একটি পাহাড়। পবিত্র কাবা থেকে ৩০০ মিটার দূরে পূর্ব-উত্তর দিকে অবস্থিত। বর্তমানে মারওয়া থেকে কাবাঘর দেখা যায় না। মারওয়ার সামান্য অংশ খোলা রাখা হয়েছে, বাকি অংশ পাকা করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
রহমতের আশায় আরাফার ময়দানে
আরাফা শব্দের অর্থ চেনা, জানা ও পরিচয় লাভ করা। আরাফা মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। মক্কা থেকে এর দূরত্ব ২২ কিলোমিটার, মিনা থেকে ১০ কিলোমিটার এবং মুজদালিফা থেকে ছয় কিলোমিটার। ঐতিহাসিক এই ময়দান তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত।
মক্কার মোয়াল্লা থেকে আরাফার মক্কাসংলগ্ন পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব সাড়ে ২১ কিলোমিটার। আরাফার ময়দান একমাত্র হজভূমি, যা হারাম শরিফের চৌহদ্দির বাইরে অবস্থিত। হজের মৌসুম ছাড়া আরাফায় মানুষ বসবাস করে না। তবে রাষ্ট্রীয় রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চালু থাকে।
আরাফার ময়দানে অবস্থিত পাহাড়ের নাম ‘জাবালু আরাফা’। এটাকে ‘জাবালে রহমত’ও বলা হয়। তবে আরাফা মানেই পাহাড় নয়। আরাফার ময়দান ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত। হজের জন্য ওই পাহাড়ে ওঠা জরুরি নয়, তবে তা মুস্তাহাব। জাবালে রহমতের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটার।
একটি রাত মুজদালিফায়
মুজদালিফা মিনা ও আরাফার মাঝখানে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। এটি মাদিক ও মুহাসসার উপত্যকার মাঝামাঝি অবস্থিত। জায়গাটি চার হাজার ৩৭০ মিটার দীর্ঘ।
মুজদালিফা শব্দটি আরবি ইজদিলাম থেকে এসেছে। এর অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। সব হজযাত্রী এই জায়গায় মিলিত হন বলে এর নামকরণ হয়েছে মুজদালিফা।
হজযাত্রীরা ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পর মিনার উদ্দেশে রওনা দিয়ে এখানেই রাত যাপন করেন। এখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে পড়তে হয়। মুজদালিফায় রাত যাপন করা ওয়াজিব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ে মুজদালিফায় অবস্থান করা শরিয়তের বিধান। মুজদালিফায় রাত যাপন না করেও কেউ ওই সময়ে উপস্থিত থাকলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে মুজদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নত। অন্যদিকে মুজদালিফায় রাত যাপন করেও সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত কেউ সেখানে অবস্থান না করলে তাঁকে দম দিতে হবে।
জামারাত
আইয়ামুত তাশরিকের (১০, ১১, ১২ তারিখ) দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে জামারায়ে সুগরা, উসতা ও কুবরায় সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। মিনা থেকে মক্কায় যাওয়ার পথে মসজিদে খাইফের কাছে পাথর নিক্ষেপের প্রথম স্থানকে ছোট শয়তান বা জামারায়ে সুগরা বলা হয়। পাথর নিক্ষেপের দ্বিতীয় স্থানকে মেজো শয়তান বা জামারায়ে উসতা বলা হয়। মিনার পশ্চিম প্রান্তে পাথর নিক্ষেপের সর্বশেষ স্থানকে বড় শয়তান বা জামারায়ে কুবরা/আকাবাহ বলা হয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/২৫৮)