অনলাইনে বাড়ছে নারীর ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৫ নভেম্বর ছিল নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। দিনটি ঘিরে দেশে যখন নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে, তখন সামনে আসে ডিজিটাল সহিংসতার আরেক অন্ধকার বাস্তবতা—অনলাইনে নারীর ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বাড়ছে। প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে ডিজিটাল নির্যাতনের নতুন নতুন রূপ।
স্বামীর মৃত্যুর পর রুহিনা (ছদ্মনাম) যখন নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় তার স্বামীর ফোনসেট নিয়ে সেটির ভেতর থাকা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ভাশুর ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল—রুহিনা যেন স্বামীর সম্পত্তির দাবি না করেন। একটি পরিবারের ভেতর থাকা এই ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা নতুন নয়; প্রতিদিনই এমন অসংখ্য নারী অনলাইনে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) জানায়, তাদের ফেসবুক পেজে প্রতিদিন ৪০–৫০টি অভিযোগ আসে, হটলাইনে আসে ৫০–৬০টি কল। অধিকাংশ অভিযোগই ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে হুমকি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অপমান, বা গোপনীয় তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সংক্রান্ত। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো—অভিযোগ এলেও বেশির ভাগ নারীই মামলা করতে চান না। তারা শুধুই চান কনটেন্ট যেন সরিয়ে নেওয়া হয়, অপরাধী ধরা হোক—এমন আগ্রহ নেই অনেকেরই। সামাজিক লজ্জা, পরিবারে জানাজানি হওয়ার ভয়, মানসিক চাপ—সব মিলিয়েই তারা আইনি পদক্ষেপ থেকে সরে আসেন।
ডিজিটাল নির্যাতন নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) জানায়, তাদের কাছে আসা অধিকাংশ অভিযোগই আসে শেষ পর্যায়ে—যখন ভুক্তভোগী অনেক তথ্য প্রমাণই ডিলিট করে ফেলেন। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে ১৪–১৫ বছরের কিশোরীরা। সম্পর্কের সময় শেয়ার করা ছবি ব্যবহার করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়, শারীরিক সম্পর্কের চাপ দেওয়া হয়। বিপাকে পড়ে তারা কাউকে কিছু জানাতে ভয় পায়, ফলে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
শিক্ষিত কিংবা উচ্চবিত্ত নারীরাও এই সহিংসতা লুকিয়ে রাখতে চান। অনেকে মনে করেন মামলা করলে ‘সম্মানহানি’ হতে পারে—ফলে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। অনেকে পরিবার, স্বামী বা অভিভাবকদের জানাতেও চান না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে নিরাপত্তাহীনতার নতুন চেহারা তৈরি হয়েছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অপমান, ছবি এডিট করে ছড়ানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল—এসব অপরাধের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিবারই প্রথম নিরাপত্তার জায়গা। শিশু–কিশোরীদের অনলাইনে কী করছে, কী দেখছে—সেগুলো জানার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। কেউ যদি অনলাইনে কোনো অনিরাপদ পরিস্থিতিতে পড়ে, তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস শুধু স্মরণ নয়—এটি সতর্কতারও দিন। কারণ নারীর ওপর সহিংসতার ধরন এখন দ্বিমাত্রিক—বাস্তব জীবনে যেমন আছে, তেমনি ডিজিটাল জগতেও। আজকের পৃথিবীতে নারীর নিরাপত্তা মানে শুধু রাস্তাঘাট নয়; নিরাপত্তা তার মোবাইল স্ক্রিনেও।