দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্য তারেক রহমান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন
যুগশঙ্খ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। জাতীয় সংসদের মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে দলটি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন, তা নিয়ে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপসারিত হওয়ার পর এটি প্রথম নির্বাচন। জানুয়ারির শুরুর দিকে টাইম ম্যাগাজিন রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বসে, যেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সামাজিক বিভাজন নিরাময়ের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে রহমান বলেন: “প্রথমত আইনের শাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা। আমাদের যে রাজনৈতিক কর্মসূচিই থাকুক, যে নীতিই গ্রহণ করি না কেন, যদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।”
নিচে টাইমের একান্ত সাক্ষাৎকার থেকে বাংলাদেশের নতুন নেতার পাঁচটি মূল দিক তুলে ধরা হলো:
জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে, যা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে, প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। এছাড়া তার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ৩,৫০০ জন বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। এসব ক্ষত এখনো খুবই তাজা। রহমানকে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে, যেগুলো হাসিনার দল আওয়ামী লীগের আমলে পুরোপুরি রাজনীতিকরণ হয়ে পড়েছিল—যেমন সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস ও নিরাপত্তা সংস্থা।
২০০১ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর দ্রুতই আওয়ামী লীগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশে ফিরে রহমান প্রতিশোধ পরিহার ও ঐক্যের বার্তা দিয়ে আসছেন, এবং শান্তি বজায় রাখতে তাকে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। বরং যদি আমরা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, দেশকে এক রাখতে পারি, তাহলে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব।”
অর্থনীতি ঠিক করা
হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি ছিল; জিডিপি ২০০৬ সালে ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য এবং যুব বেকারত্বের কারণে তার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে, এবং দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
হাসিনার পতনের পরও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা উন্নত হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, অথচ যুব বেকারত্বের হার ইতোমধ্যে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত হয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদনশীল শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারী ৪ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য বিএনপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচির মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক ভাতা প্রদান—যদিও এর অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রহমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতে চান এবং ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে চান। এছাড়া বিদেশে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিককে ভাষা ও অন্যান্য দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ভালো আয়ের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন
রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সঙ্গে এবং প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। হাসিনার পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে; তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
সম্প্রতি রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন, যা সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। তবে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন ইস্যু এখনো অমীমাংসিত। বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে সই করে “ন্যায্য পানির অংশ” দাবি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রহমান বলেন, হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অনেক চুক্তিতে “অসমতা” রয়েছে, যা সংশোধন করতে হবে। “অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে, তারপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চেষ্টা করব।”
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছিল। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনা শেষে তা ১৯ শতাংশে এ নামানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি কিছু পোশাক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। রহমান ভবিষ্যতে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আরও শুল্ক রেয়াত পাওয়ার আশা করছেন—সম্ভবত বোয়িং বিমান ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের মাধ্যমে।
‘ইসলামপন্থী’দের উত্থান নিয়ন্ত্রণ
বিএনপির বাইরে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দল হলো বাংলাদেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, যার ওপর হাসিনার আমলে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
দলটির সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা সামাজিক কল্যাণমূলক এজেন্ডা সামনে এনে নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে সমালোচকদের মতে, তাদের মৌলিক অবস্থান বদলায়নি।
বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে জামায়াতের প্রভাব সীমিত থাকবে, তবে তারা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই থাকবে। রহমান বলেন, “শুধু বিএনপির নয়, দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব—আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে না যাই। আমাদের সামনে এগোতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পায়।”
শিক্ষার্থীদের কী হবে
শেখ হাসিনাকে উৎখাতের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল। পরে আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। শিক্ষার্থী নেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামের একটি দল গঠন করে জামায়াত জোটের সঙ্গে নির্বাচন করেছে। যদিও এনসিপির জামায়াত জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং কয়েকজন দল থেকে বের হয়ে যান।
ছাত্র–জনতার নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের সম্মান জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে।’