মুন্সিগঞ্জে আলুর বাম্পার ফলনেও কৃষকের চোখে পানি, প্রতি মণে লোকসান ২০০ টাকা
যুগশঙ্খ ডেস্ক : দেশের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সিগঞ্জে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারদর অনেক কম হওয়ায় এবং মাঠে পাইকারের দেখা না মেলায় কয়েক লক্ষাধিক আলু চাষি এখন বড় ধরনের লোকসানের মুখে। ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মৌসুমে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সরেজমিনে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখাঁন ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, উত্তোলন মৌসুম ঘিরে মাঠ থেকে আলু তোলার ব্যস্ততা বেড়েছে মুন্সিগঞ্জের আলু চাষিদের। প্রান্তিক কৃষকের দীর্ঘদিনের ঘাম আর শ্রমে অর্জিত স্বপ্নের ফসল বস্তা বন্দী করে পাঠানো হচ্ছে হিমাগারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সময়ের ব্যবধানে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির দেখা না মিললে, হিমাগার থেকে কৃষক ফেরেন শূন্য হাতে। গেল কয়েক বছর ক্রমাগত লোকসান, ঋণের বোঝা ভারী হয়েছে কৃষকের, ফলে অতীতের লোকসান পোষাতে চলতি মৌসুমে লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে আলু আবাদ করেছেন জেলার কয়েক লক্ষাধিক কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১১ লাখ থেকে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত।
এই অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় বেশি আলুর উৎপাদন হওয়ায় দুর্গতি যেন পিছু লেগেছে কৃষকের, এবারও বাজার দর কম থাকায় বড় অংকের লোকসানের মুখে কয়েক লক্ষাধিক আলু চাষি।
সরজমিনে দেখা গেছে, চলতি মৌসুমে আলু সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় কমাতে সড়ক পথের চেয়ে নৌপথে বেড়েছে চাপ। উত্তোলন শেষে জমি থেকে বস্তাবন্দী করা আলু- দুই চাকার বাহন সাইকেলে করে বাড়ি নিচ্ছেন কৃষক। তবু প্রশ্ন উঠছে এত কষ্টের ফসল কেন সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছে না!
আলু চাষিদের অভিযোগ- সার, কীটনাশক বীজের দামের সঙ্গে শ্রমিক মজুরি যুক্ত হয়ে এ বছর আলু আবাদে মনপ্রতি কৃষকের খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমান আলুর পাইকারি বাজার মূল্য সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকা। এতে জমি থেকে আলু বিক্রি করে কৃষককে মনপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে দুই থেকে অন্তত আড়াইশো টাকা পর্যন্ত।
এতে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আলুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। ফলে দ্রুত বিদেশে আলু রপ্তানির জোর দাবি এ অঞ্চলের কৃষকদের। তবুও আশাজাগানিয়া বার্তা নেই স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ ও বিপণন অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী। গত পাঁচ বছর আলু আবাদ করে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পেয়ে পথে বসেছেন বহু প্রান্তিক আলু চাষি। কোনও মৌসুমে আলুর আকাশচুম্বী বাজারদর দেখা গেলেও বেশিরভাগ সময় বাজার মূল্য গিয়ে ঠেকেছে পাতাল সমান শূন্যের কোঠায়।
ফলে চাষিদের লোকসান কমাতে সরকারি টিসিবির পণ্যে আলু ক্রয় বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করাসহ কৃষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি উঠলেও সেইসব কখনোই দেখেনি আলোর মুখ।
সোমবার (২০ এপ্রিল) জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঘুরে ও ভুক্তভোগী স্থানীয় আলু চাষি এবং প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আলু চাষে সুপরিচিত জেলা মুন্সিগঞ্জে এবছর ভালো ফলন হয়েছে। আলুর গুণগত মান ও ভালো ফলন দেখে কৃষকের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দিলেও আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কৃষকের সেই হাসি ফুরিয়ে গেছে। বর্তমান বাজার মূল্যে আলু বিক্রি করে মন প্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে অন্তত দুইশত টাকা। তবুও মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের।
প্রান্তিক চাষিরা বিক্রির আশায় আলু তুলে জমিতে স্তূপ করে রাখলেও অন্যান্যবারের মত পাইকারি আলু ব্যবসায়ী ও সংরক্ষণকারীদের খুব একটা দেখা মিলছে না চলতি মৌসুমে। ফলশ্রুতিতে কৃষকরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে।
অতি সম্প্রতি রাতভর বৃষ্টি হওয়ায় জমির আলুর স্তূপ এবং অপেক্ষাকৃত আলুর নিচু জমিতে পানি আটকে যাওয়ায় ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ার শঙ্কায় আলু চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া বিগত মৌসুমে বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর বিপরীতে সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ায় হতাশার মাত্রা আরও বেড়েছে। ফলে আলু কেন্দ্রিক খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং সুপার শপে সরবরাহের মাধ্যমে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহারে কৃষি বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি আলু চাষিদের।
মুন্সিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর ৩৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে আলু আবাদেও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে ১০ লাখ ৯৭ হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন আলু ফলনের আশা করা হয়। মাঠ পর্যায়ে এ পর্যন্ত আবাদকৃত জমির ৮০ শতাংশ জমির আলু উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর জেলায় প্রতি হেক্টর জমিতে ৪২ থেকে ৪৩ মেট্রিকটন আলু উৎপাদিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছর জেলার ৬ উপজেলায় ৩৫ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। চাষিরা বলছেন, বিগত মৌসুমের বিপুল পরিমাণ লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই ধারদেনা করে উৎপাদন করা আলু এখন কৃষকের গলার কাটা। একদিকে খুচরা বাজারে দর পতন অপরদিকে মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের। এতে দিশেহারা কৃষক দাবি জানিয়েছেন দ্রুত বিদেশে রপ্তানির জন্য।
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চম্পাতলা গ্রামের আলু চাষি জামাল মণ্ডল বলেন, ৭ গণ্ডা (৪৯ শতাংশ) জমিতে ৪ হাজার ৫০০ কেজি আলু উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে মান সম্মত প্রতিমণ আলু ৪৮০ হতে ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে আর প্রতিমণ আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে সাড়ে ৫০০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, এবার কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছে। গেলো মৌসুমে বিপুল পরিমাণ লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই ধারদেনা করে উৎপাদন করা আলু এখন কৃষকের গলার কাটা। একদিকে খুচরা বাজারে দর পতন অপরদিকে মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের, ফলে লোকসান ঠেকাতে দ্রুত আলু বিদেশে রপ্তানির জোর দাবি জানাচ্ছি।
মহকালী ইউনিয়নের কেওয়ার নূরাইতলী এলাকার অপর কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, এবার সানসাই জাতের আলুর দেখতে যেমন সুন্দর ফলনও ভালো হয়েছে তাই কৃষকরা ডায়মন্ড, ভ্যানিলা জাতের আলুর আবাদ থেকে সরে এসেছে।
অভিজ্ঞ এ কৃষকের মতে, যারা বাক্স আলু (হল্যান্ড ডায়মন্ড) দ্বিতীয় দফায় রোপণ করেছে কিংবা ব্র্যাক, এসিআই বিএডিসি বীজ রোপণ করেছে তাদের ফলন ভালো হয়নি।
মহাকালী, রণছ এলাকার কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে ভুক্তভোগী কৃষক রমজান মাতবর ও সবুর আলী জানান, অনুকূল আবহাওয়া আর আলু গাছে পোঁকা-মাকড়ের সংক্রমণ না হওয়া সর্বোপরি কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়াতে এ বছর আলুর ফলন বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে।
তারা আরও বলেন, বছরের পর বছর লোকসান থেকে কৃষক বাঁচাতে হলে রপ্তানির বিকল্প নেই। এছাড়া এ জেলার পটেটোফ্লেক্স কারখানাগুলোও সচল করলে কৃষকরা দাম পাবেন।
অন্যদিকে, এমন পরিস্থিতিতে কৃষক বাঁচাতে আলুর বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি আগামী মৌসুম ঘিরে বিকল্প কিছু নিয়ে ভাবছে জেলা কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা করে বৈজ্ঞানিক পন্থা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সারের ডোজ প্রয়োগ করে চাষাবাদ করলে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে আলুর ফলন বেশ ক্ষতি হয়েছে, তাই মুন্সিগঞ্জের প্রধান ফসল আলুতে এবার কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন আশা করি।
তিনি বলেন, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে টঙ্গীবাড়ি উপজেলায় আলু কেন্দ্রিক খাবার তৈরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে অন্যান্য উপজেলায়ও হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএডিসি ব্র্যাক, এসিআইসহ বিভিন্ন কোম্পানির আলু বীজ রোপণে সুনির্দিষ্ট কারিগরি নির্দেশনা থাকে, তা অনুসরণ না করায় কোনও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আর প্রণোদনা প্রদান প্রক্রিয়াধীন।
তবে এ বছর বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আলুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন আশাজাগানিয়া বার্তা নেই অধিদপ্তরের কাছে। এ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে মুন্সিগঞ্জ জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হতে পারে সাড়ে ১০ লাখ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন।